• ৩০শে মে, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ , ১৬ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ , ২২শে জিলকদ, ১৪৪৫ হিজরি

লাঠিখেলা বাঙালির ঐতিহ্য

khaskhabarbd24
প্রকাশিত মার্চ ১২, ২০২৩

লোকায়ত বাংলার খেলাধুলার মধ্যে লাঠিখেলা একটি বিশেষ স্থান অধিকার করে আছে। এই খেলার মধ্য দিয়ে আবহমান বাংলার ঐতিহ্য, শৌর্য-বীর্য আর বীরত্বের পরিচয় খুঁজে পাওয়া যায়। যন্ত্রসভ্যতার প্রসার ও আধুনিক নগরায়নের ফলে গ্রাম-বাংলার অনেক লোকক্রীড়ার মতো লাঠিখেলাও আজ ক্রমশ ক্ষয় ও বিলুপ্তির পথে। অথচ লাঠি একদিন বাঙালির শক্তির প্রতীক ছিলো ছিলো প্রতয়ের প্রতীক-ছিলো ক্রীড়ার মাধ্যম।

লাঠি এককালে ছিলো বাঙালির প্রধান হাতিয়ার। আত্মরক্ষার প্রয়োজনে লাঠির বিকল্প ছিলোনা। স্বাধীনতার সংগ্রামে-মুক্তির লড়াইয়েও লাঠির ভূমিকা ছিলো বীরত্বব্যঞ্জক। ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের প্রথম পর্যায়ে লাঠি ছিলো মুক্তিকামী বাঙালির অন্রতম সহায়। তীতুমীরের ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদী শুক্তির বিরুদ্ধে লড়াইয়ে তাঁর বাঁশের কেল্লা আর লাঠিয়াল বাহিনীর বূমিকার কথা আজ ইতিহাসের এক উজ্জ্বল অধ্যায়।

সেই ঐতিহ্যবাহী লাঠি কালিক বিবর্তনে ক্রমান্বয়ে লৌকিক খেলাধুলার মধ্যে আশ্রয় নিয়েছে। লাঠিখেলা গ্রামীণ জীবন থেকে উঠে এসে নাগরিকজনের মনোরহ্ঝন ও চিত্তবিনোদনের উপকরণ হিসেবেও স্বীকৃতি লাভ করেছে। লাঠিখেলার এই উজ্জীবন ও নবরুপায়নের স্বাপিন্ক পুরুষের নাম সিরাজুল হক চৌধুরী (১৯১১-১৯৮৭), ডিনি জনগনের প্রদত্ত ওস্তাদ ভাই নামেই পরিচিত। তিনি রংপুরের তুষভান্ডারের বিশিষ্ট সাহিত্যিক ও সমাজসেবক মোহাম্মদ রেয়াজউদ্দীন আহমদের সহযোগিতায় সারা বাংলার লাঠিয়ালদের সংগঠিত করে “লাঠিয়াল বাহিনী” নামে সংগঠন গড়ে তোলেন। ওস্তাদ ভাই সিরাজুল হক চৌধুরীর অক্লান্ত পরিশ্রম ও পরিকল্পনায় অবজ্ঞাত-অবহেলিত-উপেক্ষিত-অশদৃত গ্রামীণ লাঠিখেলা ক্রীড়াশিল্প হিসেবে স্বীকৃতি ও সমাদর লাভ করে। ওস্তাদ ভাই এই লাঠিয়াল বাহিনীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পৃক্ত করেন কবি জামিল বিন জিয়ারত (জুনু ভাই) ও বিশিষ্ট লেখক-সাংবাদিক ‘বাঙ্গালী’ পত্রিকার সম্পাদক মোহাম্মদ সালাউদ্দীনকে। কেন্দ্রীয় কচি কাঁচার মেলা’ও প্রতিষ্ঠাতা ও প্রাণপুরুষ রোকনুজ্জামান খান (দাদা ভাই) এর আগ্রহে তিনি এই মেলার সঙ্গে প্রতিষ্ঠালগ্ন তেকেই জড়িত থেকে মেলার সদস্যদের লাঠি খেলা কৌশল শিক্ষা দিয়েছেন। শুধু তাই নয়, তিনি লেখনীর মাধ্যমেও লাঠিখেলাকে একটি বিধিবদ্ধ নিয়ম-প্রণালীর অন্তভূক্ত করেছেন। ষাটের দশকে ঢাকা থেকে প্রকাশিত শিশু কিশোর বার্ষিকী পূবালী ফসল পত্রিকায় তিনি লাঠিখেলা সম্পর্কে যে মনোজ্ঞ সচিত্র প্রবন্ধ রচনা করেন তা বিশেষ প্রশংসা অর্জন করে। এই আগেও চল্লিশের দশকে নদীয়া কৃষ্ণনগর থেকে কবি নিহাররঞ্জন সিংহের প্রশসা অর্জন করে। এর আগেও চর্লিশের দশকে নদীয়া কৃষ্ণনগর থেকে কবি নিহাররঞ্জন সিংহের সম্পাদনায় প্রকাশিত মাসিক ‘কচি-কথা’য় লাঠিখেলা সম্পর্কে প্রবন্ধ লিখে সকরের দৃষ্টি আকর্ষন করেন। সিরাজুল হক চৌধুরী তাঁর আত্মজীবনী জীবনের বাঁকে বাঁকে গ্রন্থে তাঁর লাঠিয়াল- জীবনের নানা চমপ্রদ কাহিনী তুলে ধরেছেন। তাঁর লাঠি-লড়ি-সড়কি গ্রন্থে বিবৃত হয়েছে লাঠিখেলার নিয়ম-কানুন ও কলা-কৌশল। শেষ জীবনে তিনি লাঠিখেলাকে একটি প্রতিষ্ঠানিক কাঠামোয় রুপদানের জন্য জাতীয় লাঠিখেলা শিক্ষা শিবির’-এর প্রবর্তন করেন। লাঠি খেলাকে জাতীয় পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার প্রয়াস ও স্বপ্ন তাঁর মৃত্যুতে অপূর্ণ থেকে যায়।
সিরাজুল হক চৌধুরীর মৃত্যুর পর তাঁর অনুসারী, পূর্ণগ্রাহী ও স্বজনবৃন্দ নতুন উৎসাহ ও প্রেরণায় লাঠিখেলাকে জাতীয় পর্যায়ে প্রতিষ্ঠার ভূমিকা গ্রহণ করেছেন। প্রবীন লাঠিয়ালদের সহযোগিতায় ও লাঠিখেলাপ্রেমী সূধীজনের প্রেরণায় বাংলাদেশ লাঠিয়াল বাহিনী’র হাল ধরেছেন চক্রমনি উপাধিপ্রাপ্ত ওস্তাদ ভাইয়ের সুযোগ্য পুত্র মনজুরুল হক চৌধুরী (রতন)। চক্রমনির নেতৃত্ব ও পরিচালনায় ১৯৯৩ সালে ঢাকায় অনুষ্ঠিত ৬ষ্ঠ সাফ গেমসের সমাপণী অনুস্ঠানে বাংলাদেশ লাঠিয়াল বাহিনীর সদস্যবৃন্দ লাঠিখেলার নানা কসরৎ দেখিয়ে দেশী-বিদেশী দর্শকদের মুগ্ধ মোহিত করেন।
লোকঐহিত্য ও লোকসংস্কৃতি সংরক্ষণ ও উপস্থাপনে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ যখণ আন্তরিক আগ্রহী ও তৎপর, আমারা তখন এ-বিষয়ে অনাগ্রহী ও উদাসীন। কোন জাতি তার ঐতিহ্যকে আগেই আমাদের ঐতিহ্যপূর্ণ লোক সংস্কৃতির একটি নিদর্শন হিসেবে লাঠিখেলার অস্তিত্ব রক্ষা ও উজ্জীবনের আশু ব্যবস্থা গ্রহণ প্রয়োজন। সব দেশেই তাদের ঐতিহ্যিক-ক্রীড়ার স্বীকৃতি আছে। আমাদের দেশেও লাঠিখেলাকে ঐতিহ্যিক ক্রীড়ার জাতীয় স্বীকৃতি দিয়ে এর উন্নয়নের প্রয়াসী হওয়া প্রয়োজন। পাশাপাশি আর-একিট প্রস্তাব পেশ করি ঃ গ্রামীণ ক্রীড়া উন্নয়ন বোর্ড, এর মতো একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা। তা হলে বাংলা ও বাঙালির হাজার বছরের ঐতিহ্য লাঠিখেলা নতুন আঙ্গিকে দেশের মানুষ ও বিশ্বজনের সম্মুখে উপস্থাপিত হয়ে আমাদের গৌরবের মুকুটে নতুন স্বর্ণ-পালক সংযোজিত করবে।